Мы используем файлы cookie.
Продолжая использовать сайт, вы даете свое согласие на работу с этими файлами.

ভিক্ষু

Подписчиков: 0, рейтинг: 0
মিশরের মহান সেন্ট আন্থনি, যাঁকে খ্রিস্টান আধ্যাত্মিকতার জনক বলা হয়।

একজন ভিক্ষু (ইংরাজিতে, মঙ্ক, গ্রীক, মোনাকোস, "একক ও নিঃসঙ্গ" এবং ল্যাটিন, মোনাচুস) হলেন, একাকী অথবা অন্যান্য ভিক্ষুদের সাথে বিবাগি জীবনযাপনের দ্বারা ধর্মীয় সন্ন্যাসব্রত পালন করা ব্যক্তি। একজন মানুষ অন্য সকল জীবের প্রতি সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করার কারণে ভিক্ষু হতে পারেন অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে সমাজের মূলস্রোতের জীবনধারা ত্যাগের মাধ্যমে সন্ন্যাস জীবন লাভ করতে পারেন এবং প্রার্থনা ও সুগভীর চিন্তাভাবনার মধ্যে জীবন কাটাতে পারেন। এই ধারণাটি অতি প্রাচীন এবং অনেক ধর্ম ও দর্শনেই এটি লক্ষ্য করা যায়।

গ্রীক ভাষায় এই শব্দটি নারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে, কিন্তু আধুনিক ইংরেজি ও বাংলায় এটি প্রধানত পুরুষদের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। ভিক্ষুণী শব্দটি মহিলা সন্ন্যাসীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।

যদিও মোনাকোস শব্দটি খ্রীস্টান শব্দ থেকে উদ্ভূত, তবে ইংরেজি মঙ্ক শব্দটি শিথিলভাবে নারী ও পুরুষ উভয় ক্ষেত্রেই ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় এবং দার্শনিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়। যদিও জাতিবাচক হওয়ায়, নির্দিষ্ট প্রকৃতির সন্ন্যাসীদের নামের পরিভাষাগুলিকে বদলানো যায় না; যেমন, সেনোবাইট, হার্মিট, অ্যাঙ্কোরাইট, হেসিচাস্ট এবং সলিটারি।

পূর্ব খ্রিষ্টানত্ব

মাউন্ট আথোস সেন্ট ডায়োনিসিয়াসের মঠ

পূর্ব ধর্মীয় বিশ্বাসে সন্ন্যাসের একটি বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রয়েছে : “দেবদূতরা হলেন ভিক্ষুদের আলো, ভিক্ষুরা হলেন সাধারণ মানুষের আলো” (সেন্ট জন ক্লিমাকোস)। গোঁড়া সন্ন্যাসীরা জগৎ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নেন যাতে তারা জগতের জন্য অবিরাম প্রার্থনা করে যেতে পারেন। তারা সাধারণভাবে সামাজিক সেবা করবার প্রাথমিক উদ্দেশ্য নিয়ে ব্রতী হন না, বরং থিওসিস বা ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সাধনাতেই নিমগ্ন থাকেন। যেহেতু দরিদ্রসেবা এবং অভাবীদের যত্ন নেওয়া সন্ন্যাসের একটি বাধ্যতামূলক কর্তব্য, তাই সকল মঠই “সমাজবিচ্ছিন্ন” নয়। যোগাযোগের মাত্রা যদিও সম্প্রদায় থেকে সম্প্রদায়ে ভিন্ন হয়। অন্যদিকে, হার্মিটরা, বহির্বিশ্বের সঙ্গে অতি অল্প সংযোগ রাখে অথবা একেবারেই রাখে না। 

গোঁড়া সন্ন্যাসে পশ্চিমীদের মত ধর্মীয় কোন বিধান নেই, সেন্ট বেনেডিক্টের নিয়মাবলীর মত এদের তেমন কোন নিয়মাবলীও নেই। বরং পূর্ব সন্ন্যাসীরা ডেজার্ট ফাদার্স এবং চার্চ ফাদার্সের লেখা পড়েন এবং সেখান থেকে অনুপ্রাণিত হন; এগুলির মধ্যে সম্ভবত সবথেকে প্রভাবশালী হল হোলি মাউন্টেনের সেন্ট নিকোডেমোস এবং কোরিন্থের সেন্ট মাকারিওস সংকলিত মহান সেন্ট বাসিল এবং ফিলোকালিয়ার গ্রেটার অ্যাসকেটিকন এবং লেসার অ্যাসকেটিকন। গোঁড়া চার্চের তপশ্চর্যার তত্ত্বের গোড়ার কথাই হল হেসিচ্যাসম।

রাশিয়ার নিঝনি নভগরদে ভল্গা নদীর ওপর হোলি ট্রিনিটি-মাকারিয়েভ মোনাস্ট্রির সাধারণ দৃশ্য।

বেশিরভাগ সম্প্রদায়ই স্বাবলম্বী, এবং সন্ন্যাসীদের প্রাত্যাহিক জীবন সাধারণত তিনটি ভাগে বিভক্ত : (অ) ক্যাথলিকনে (মঠের মূল গীর্জা) সম্মিলিতভাবে পূজার্চনা; (আ) কঠোর শারীরিক পরিশ্রম; এবং (ই) ব্যক্তিগত প্রার্থনা, আধ্যাত্মিক পাঠ, এবং প্রয়োজন হলে বিশ্রাম। আহার সাধারণত সকলে মিলে ট্র্যাপেজা (ভোজনালয়) নামক একটি বড় খাবার ঘরে, একটি লম্বা খাবার টেবিলে বসে খাওয়া হয়। খাদ্য সাধারণ মানের হয় এবং নীরবতার সঙ্গে খাওয়া হয়; খাওয়ার সময় হোলি ফাদার্‌সের আধ্যাত্মিক রচনা থেকে ভ্রাতৃবর্গের একজন পাঠ করেন। সন্ন্যাসী জীবনযাত্রায় কঠোর নিবেদন একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। সেনোবাইটিক সম্প্রদায়ে, সমস্ত ভিক্ষুসম্প্রদায় তাদের নির্দিষ্ট মঠের ঐতিহ্যাগত নিয়মানুসারে একটি সাধারণ জীবনযাত্রা পালন করেন। এই অনুক্রম বজায় রাখবার জন্য তাদের কঠোর শ্রম করতে হয় যার দ্বারা তারা তাদের নিজেদের ত্রুটিগুলি উপলব্ধি করতে পারে এবং এগুলি সাথে কীভাবে সৎ পথে মোকাবিলা করা যায় তা বোঝবার জন্য তাদের আধ্যাত্মিক গুরু তাদের পথনির্দেশ দেন। এই একই কারণে, ভিক্ষুদের শ্রেণী থেকেই বিশপদের নির্বাচন করা হয়।

পূর্ব সন্ন্যাস তিনটি ভিন্ন রূপে পাওয়া যায় : অ্যাঙ্কোরাইটিক (বিচ্ছিন্নভাবে একাকী জীবনযাপন), সেনোবাইটিক (একজন মঠাধিকারী অথবা মঠাধিকারীণির প্রত্যক্ষ অধীনে একটি সম্প্রদায়ের জীবনযাপন এবং পুজার্চনা) এবং এই দুয়ের একটি ‘মধ্যপন্থা’, যা স্কেট নামে পরিচিত (কিছু ব্যক্তির একটি গোষ্ঠী যাঁরা পৃথকভাবে বসবাস করে, কিন্তু একে অপরের কাছেই অবস্থান করে; এঁরা কেবলমাত্র রবিবার এবং পরবের দিন মিলিত হয়, কিন্তু কাজকর্ম এবং প্রার্থনা করে নিভৃতে, একজন বয়স্ক ব্যক্তির অধীনে)। সাধারণভাবে একজনকে প্রথমে সেনোবাইটিক সম্প্রদায়ে প্রবেশ করতে হয়, কেবলমাত্র পরীক্ষা এবং আধ্যাত্মিক বৃদ্ধিতে সফল হলে, তবেই তারা স্কেট হতে পারেন, অথবা, আরও উন্নতিলাভ করলে নিভৃতাচারী অ্যাঙ্কোরাইট হতে পারেন। তবে, সাধারণত একজন স্কেট অথবা নিভৃতাচারী হন না; বেশিরভাগ সন্ন্যাসীই সারাজীবন ধরে সেনোবিয়াম থেকে যান।

সাধারণভাবে, গোঁড়া সন্ন্যাসীরা নিজেদের পরিবারসহ বহির্বিশ্বের সাথে সামান্য যোগাযোগ রাখেন অথবা কোন যোগাযোগই রাখেন না। ঈশ্বরের সাথে মিলনই সন্ন্যাস জীবনের মূল উদ্দেশ্য, এবং পৃথিবী ত্যাগ করবার মাধ্যমে (অর্থাৎ জীবনের মায়া) সেই মিলন সাধন সম্ভব হয়। মস্তকমুণ্ডনের পর, গোঁড়া ভিক্ষু এবং ভিক্ষুণীরা কখনও চুল কাটবার অধিকার পায় না। অকর্তিত চুল ও দাড়ি, তাদের নেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রতীক, ইহা ওল্ড টেস্টামেন্টের নাসরীয়দের কথা মনে করিয়ে দেয়। সন্ন্যাসীদের মুণ্ডন তাদের পবিত্র জীবনের প্রতীক, এবং এর মাধ্যমে তারা তাদের স্ব-ইচ্ছা পরিত্যাগ করেন।

মাত্রা

সর্বাগ্রগামী ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের পরিধেয় গ্রেট স্কিমা।

ভিক্ষু হওয়ার পদ্ধতিটি ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরগামী করা হয়, কারণ এতে সারাজীবন ধরে ঈশ্বরের প্রতি নিবেদিত থাকবার কঠিন ব্রত নিতে হয় এবং এতে হাল্কা চালে প্রবেশ করা যায় না। গোঁড়া সন্ন্যাসধর্মে ব্রতীদশা পূর্ণ করলে, সন্ন্যাসের তিনটি স্তর রয়েছে। পূর্ব গীর্জায় কেবল একটিই সন্ন্যাসরীতি প্রচলিত রয়েছে (সামান্য কিছু স্থানিক পার্থক্যসহ) এবং ইহা ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের ক্ষেত্রে একই। ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি স্তরে কিছু কিছু রীতি প্রদত্ত হয় এবং রীতিগুলি সম্পূর্ণ আয়ত্ত করলে সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হয়, একে “মহান স্কিমা” বা “মহান রীতি” বলা হয়।

মঠাধিকারীরাই সাধারণত বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানগুলি সম্পন্ন করেন, কিন্তু যদি মঠাধিকারী ব্যক্তি যদি যাজক (প্রিস্ট) না হন, অথবা সম্প্রদায়টি যদি বিহার (কনভেন্ট) হয়, তবে একজন হায়ারোমঙ্ক এইসকল কাজগুলি সম্পন্ন করেন। মঠাধিকারী বা হায়ারোমঙ্ক যিনি মুণ্ডনের কাজটি করেন, তাকে যাঁর মুণ্ডন করা হচ্ছে, অন্ততপক্ষে তার সমান পদমর্যাদার হতে হয়। অন্যভাবে বললে, যে হায়ারোমঙ্কের মুণ্ডনের মাধ্যমে “মহান স্কিমা” হয়েছে, কেবলমাত্র তিনিই একজন স্কিমামঙ্কের মুণ্ডন করতে পারেন। যদিও একজন বিশপ, যেকোন পদমর্যাদার (এমনকি তার নিজের পদমর্যাদারও) ব্যক্তির মুণ্ডন করতে পারেন।

ব্রতী বা নোভিস (চার্চ স্ল্যাভোনিক : পসলুশনিক), আক্ষ. “যিনি অনুগত” – যাঁরা কোন মঠে যোগদান করতে ইচ্ছুক হন, তাদের প্রথম নোভিস বা ব্রতী হিসেবে জীবন শুরু করতে হয়। মঠে আসার পর এবং অতিথি হিসেবে কমপক্ষে তিনদিন থাকবার পর, শ্রদ্ধেয় মঠাধিকারী বা মঠাধিকারীণি প্রার্থীকে ব্রতী হিসেবে আশীর্বাদ করেন। একজন ব্রতীর পোশাক পরিধানের জন্য কোন বাহ্যিক আচারের আয়োজন করা হয় না, তিনি সাধারণভাবে ব্রতীর পোশাক পরিধানের অনুমতি গ্রহণ করেন। পূর্ব সন্ন্যাস প্রথানুসারে, ব্রতীরা ভিতরে কালো ক্যাসক বা আলখাল্লা জাতীয় পোশাক পরিধান করতে পারেন বা নাও পারেন (গ্রীক :  অ্যান্টেরিয়ন, এইসোরাসন; চার্চ স্ল্যাভোনিক : পোড্রিয়াসনিক) এবং নরম সন্ন্যাস টুপি পরেন (গ্রীক : স্কৌফোস, চার্চ স্ল্যাভোনিক : স্কুফিয়া); তবে এটি স্থানীয় সম্প্রদায়ের রীতির ওপর নির্ভর করছে, এবং ইহা মঠাধিকারীর নির্দেশ অনুসারে চলে। ভিতরের ক্যাসক এবং স্কৌফোস গোঁড়া সন্ন্যাস প্রথার প্রথম অংশ। কিছু কিছু সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রতীরাও চামড়ার বেল্ট ব্যবহার করেন। তাদের প্রার্থনা রশি (Prayer rope) দেওয়া হয় এবং যীশুর প্রার্থনার সময়ে এটি ব্যবহারের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। যদি একজন ব্রতী ব্রতকালে এইধরনের জীবন পরিত্যাগ করেন, তবে তাদের কোন শাস্তি হয় না। যদি তার ব্যবহার সন্ন্যাস জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয় অথবা তার ঊর্ধ্বতন মনে করেন যে তাকে আর সন্ন্যাসধর্মে থাকতে বলা যাবে না, তবে সেই ব্যক্তিকে সন্ন্যাস পরিত্যাগ করতে বলা যেতে পারে। যখন মঠাধিকারী অথবা মঠাধিকারীণী মনে করেন যে ব্রতী এবার প্রস্তুত, তবে তাকে তার ইচ্ছানুসারে মঠে যোগ দিতে আহ্বান করা হয়। কেউ কেউ, বিনম্রতার কারণে, সারাজীবন ব্রতী থেকে যান। সন্ন্যাস জীবনের প্রতিটি স্তরেই প্রবেশ হয়, ব্যক্তির নিজস্ব ইচ্ছানুসারে।

রাসসোফোর (চার্চ স্ল্যাভোনিক : রিয়াসোফোর), আক্ষ. ‘লম্বা পোশাক পরিহিত’ – যদি ব্রতী ভিক্ষু হওয়ার দিকে এগোতে চায়, তবে তাকে মুণ্ডন (Tonsure) নামক একটি আনুষ্ঠানিক প্রথার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় যার মাধ্যমে তিনি সন্ন্যাসের প্রথম স্তরের পোশাক পরবার সুযোগ পান। যদিও এখানে কোন নিয়মমাফিক শপথগ্রহণ করা হয় না, তবে প্রার্থীকে সন্ন্যাস জীবনের কঠোরতায় নিজেকে নিবেদনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হয়। এরপর মঠাধিকারী মুণ্ডন করেন, মাথার চারটি অংশের কিছু চুল কেটে যোগ-আকৃতিবিশিষ্ট নকশা করে তোলেন। প্রার্থীকে এরপর বাইরের ক্যাসক দেওয়া হয় (গ্রীক : রাসন, এক্সোরাসন অথবা ম্যাণ্ডোরাসন, চার্চ স্লোভানিক : রিয়াসা) – উপরে পরার আলখাল্লাবিশেষ, পশ্চিমী দুনিয়ায় যাকে কাউল (Cowl) বলা হয়, কিন্তু এটি হুড বা ঘোমটা ছাড়া – এই পোশাক থেকেই রাসসোফোর নাম প্রাপ্ত হয়। তাকে পর্দাসমেত প্রান্তবিহীন টুপি দেওয়া হয়, যাকে ক্লোবুক বলে এবং একটি চামড়ার বেল্টও তার কোমরের বাঁধা থাকে। তার রীতি সাধারণত কৃষ্ণবর্ণ, কারণ তিনি এখন বিশ্বের কাছে মৃত, এবং তার একটি নতুন নাম রাখা হয়। যদিও রাসসোফোর কোন নিয়মমাফিক প্রতিশ্রুতি নেন না, তবু তিনি নৈতিকভাবে মঠ প্রাঙ্গণে তার বাকি জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য থাকেন। কেউ কেউ উচ্চতর মাত্রায় না উঠে, রাসসোফোর হিসেবেই বসবাস করেন।

স্ট্র্যাভ্রোফোর (চার্চ স্ল্যাভোনিক : ক্রেসটোনোসেটস্‌), আক্ষ. ক্রুশবাহক – পূর্ব সন্ন্যাসের পরবর্তী পর্যায়ে উত্তরণ প্রথম মুণ্ডনের কয়েক বছর পরে হয়; যখন মঠাধিকারী বুঝতে পারেন যে ভিক্ষু নিয়মানুবর্তীতা, নিবেদন এবং বিনম্রতার সঠিক স্তরে পৌঁছে গেছেন তখন তিনি পরবর্তী পর্যায়ে তাকে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবেন। এই স্তরটিকে লিটল স্কিমাও বলা হয়, এবং একে মহান স্কিমার বাগদান হিসেবে ধরা হয়। এই পর্যায়ে, ভিক্ষু স্থায়িত্ব, পবিত্রতা, আনুগত্য এবং দারিদ্র্যের প্রতিশ্রুতি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন। এরপর তাকে মুণ্ডন করানো হয় এবং রীতি অনুসারে পোশাক পরানো হয়, যাতে রাসসোফোরের পোশাকের সাথে পারামান্ড্যাস (চার্চ স্লোভানিক : পারামান) নামে একটি পোশাক যুক্ত হয়; এটি হল একটি বর্গাকার কাপড়ের অংশ যা পেছনে পরা হয়, এটি খ্রিস্টান প্যাশনের উপাদান দিয়ে সূচিকর্ম করা হয়ে থাকে (উপরের চিত্র দেখুন), এবং এটি হৃৎপিণ্ডের কাছে একটি কাঠের ক্রুশ এর সঙ্গে যুক্ত থাকে। পারামান্ড্যাস খ্রিস্টের জোয়ালকে চিহ্নিত করে। এই সংযুক্তিকরণের কারণে, তাকে স্ট্র্যাভ্রোফোর বা ক্রুশবাহক বলা হয়। তাকে কাঠের হাতক্রুশ দেওয়া হয় (অথবা “পেশা ক্রুশ”) যেটি তিনি তার আইকন কর্ণারে রেখে দেন, এবং একটি মৌ-মোমের মোমবাতি দেওয়া হয় যা তার সন্ন্যাস সতর্কতার পরিচায়ক যে সতর্কতার মাধ্যমে তিনি নিজেকে ঈশ্বরের কাছে উৎসর্গ করছেন। তাকে সমাধিস্থ করা হবে ক্রুশ ধরা অবস্থায়, এবং তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় মোমবাতিটি জ্বলতে থাকবে। এই স্ল্যাভিক প্রথায়, স্ট্র্যাভ্রোফোর সন্ন্যাস আঙরাখাও পরিধান করেন। রাসসোফোরদের তুলনায় স্ট্র্যাভ্রোফোররাই বেশি রাসসন (উপরের আলখাল্লা জাতীয় পোশাক) পরিধান করেন। মঠাধিকারী স্ট্র্যাভ্রোফোর ভিক্ষুর প্রার্থনার নিয়মকানুন বৃদ্ধি করেন, আরও কঠোর সংযমী জীবনযাত্রা করবার অনুমতি দেন এবং ভিক্ষুকে আরও বেশি দায়িত্ব প্রদান করেন।

মহান স্কিমা (গ্রীক : মেগালোস্কিমোস, চার্চ স্ল্যাভোনিক : স্খিমনিক) – যেসব ভিক্ষুদের মঠাধিকারী মনে করেন যে তারা আধ্যাত্মিক উন্নতি অতি উচ্চস্তরে পৌঁছে গেছে, তাদের শেষ পর্যায় অর্থাৎ মহান স্কিমা (Great Schema) পর্যায়ে উত্তীর্ণ করা হয়। স্কিমাভিক্ষুর মুণ্ডন স্ট্র্যাভ্রোফোরের মতই একই বিন্যাসে করা হয়, তিনিও একই প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হন এবং মুণ্ডন পদ্ধতিও উভয় ক্ষেত্রেই একই। শুধু স্ট্র্যাভ্রোফোরের থেকে একটি পোশাক এঁদের বেশি পরতে হয় যার নাম আনালাভোস (চার্চ স্ল্যাভোনিক : আনালাভ); ইহা মহান স্কিমার প্রতীকসমন্বিত সন্ন্যাস-পোশাক। এই কারণে আনালাভোসকেই কোন কোন সময়ে “মহান স্কিমা” বলা হয়। আনালাভোস সামনের দিকে এবং পিছনের দিকে নেমে আসে এবং পশ্চিমী সন্ন্যাসে যাকে স্ক্যাপুলার বলা হয় অনেকটা তার মত এটি দেখতে, যদিও দুটি পোশাকের মধ্যে সম্ভবত কোন সম্পর্ক নেই। এটিতে সাধারণত খ্রিস্টান প্যাশনের উপাদান এবং ট্রিসাজিয়ন (দেবদূতের মন্ত্রসংগীত) দ্বারা জটীলভাবে সূচিকর্ম করা হয়। এই পোশাকের গ্রিক রূপে কোন ঘোমটা থাকে না, স্ল্যাভিক রূপে একটি ঘোমটা থাকে এবং কাঁধের কাছে একটি খুঁটও থাকে, যাতে ভিক্ষুর কাঁধ, বুক এবং পিঠে পোশাকটি বড় ক্রুশ আবরণ তৈরি করতে পারে। আরেকটি অংশ এতে যুক্ত হয় যাকে পলিস্ট্র্যাভিয়ন বা “অনেকগুলি ক্রুশ” বলা হয়, এটি একটি রজ্জু দ্বারা গঠিত হয় যাতে অনেকগুলি ছোট ছোট ক্রুশ দ্বারা বিনুনি করা থাকে। পলিস্ট্র্যাভিয়ন একটি ভিক্ষুর জোয়াল হিসেবে থাকে এবং এটি আনালাভোসকে সঠিক জায়গায় ধরে রাখতে সাহায্য করে। এটি একজন সন্ন্যাসীকে মনে করিয়ে দেয় যে তিনি খ্রিস্টের কাছে আবদ্ধ এবং তার বাহুদুটি সাংসারিক কাজের জন্য আর উপযুক্ত নয়, বরং তিনি শুধুমাত্র স্বর্গীয় রাজত্বের জন্য সংগ্রাম করবেন। গ্রীকদের ক্ষেত্রে, এইসময় আঙরাখাটি যুক্ত করা হয়। মেগালোস্কিমোসের পারামান্ড্যাস স্ট্র্যাভ্রোফোরের তুলনায় বড়, এবং তিনি যদি ক্লোবুক পরেন, তবে সেটি একটি স্বতন্ত্র অঙ্গুষ্ঠানার মত আকৃতির হয় যাকে কৌকৌলিয়ন বলা হয়; এটির পর্দার উপর ক্রুশের সূচীকর্ম করা থাকে। কিছু সন্ন্যাস প্রথানুসারে মহান স্কিমা কেবলমাত্র ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের মৃত্যুশয্যায় দেওয়া হয় এবং অন্যান্যদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ২৫ বছরের সেবাতেই আয়ত্ত করা সম্ভব।

যাজক না হলেও, পূর্ব গোঁড়া ভিক্ষুদের “ফাদার” বলা হয়, কিন্তু যখন নিজেদের মধ্যে তারা বাক্যালাপ করেন, তখন ভিক্ষুরা প্রায়শই নিজেদের “ব্রাদার” বলে অভিহিত করেন। ব্রতীদের সর্বদাই “ব্রাদার” বলে ডাকা হয়। গ্রীকদের মধ্যে, বয়স্ক ভিক্ষুদের, তাদের অবদানের কারণে সম্মান প্রদর্শনার্থে, ঘেরোনডা অথবা “এল্ডার” বলা হয়। স্ল্যাভিক রীতি অনুযায়ী, এল্ডার উপাধিটি (চার্চ স্ল্যাভোনিক : স্ট্যারেটস্‌) সাধারণত যাঁরা আধ্যাত্মিক জীবনের উন্নতস্তরে পৌছেছেন এবং যারা অন্যদের উপদেষ্টা হিসেবে কর্তব্যনিরত তাদের জন্যই সংরক্ষিত।

গোঁড়াদের ক্ষেত্রে, মাদার হল ভিক্ষুণীদের জন্য একেবারে সঠিক শব্দবন্ধ; এঁরা হলেন মুণ্ডনকৃত স্ট্র্যাভ্রোফোর অথবা তাদের উচ্চতর। ব্রতী এবং রাসসোফোরদের “সিস্টার” হিসেবে বলা হয়। ভিক্ষুণীরাও ভিক্ষুদের মতই একই আধ্যাত্মিক জীবনযাত্রা পালন করেন এবং সেই কারণে এদেরও মোনাকাই (মোনাকোসের স্ত্রীলিঙ্গে বহুবচন) বলা হয় এবং এদের সম্প্রদায়কে একইভাবে মোনাস্ট্রি বা মঠ বলা হয়ে থাকে।

অনেক (কিন্তু সমস্ত নয়) গোঁড়া ধর্মীয় শিক্ষালয় মঠগুলির সাথে যুক্ত থাকে এবং এর ফলে পৌরহিত্যে অভিষেকের প্রস্তুতির সঙ্গে সম্প্রদায়ের প্রার্থনা-জীবনকে যুক্ত করা হয়; আশা করা হয়, এইভাবে জ্ঞানী ভিক্ষুদের পরামর্শ আর তাদের উদাহরণ থেকে উপকৃত হওয়া যাবে। গোঁড়া গীর্জার পবিত্র গির্জা আইনানুসারে পাদরিবর্গের মধ্যে থেকে বিশপদের বাছাই করা হয়। বিশেষভাবে তাদের সন্ন্যাসী হতে হয়, কেবল কৌমার্য থাকলেই চলে না (দেখুন যাজকীয় কৌমার্য)। যেসকল ভিক্ষু পৌরোহিত্য প্রাপ্ত হয়েছেন তাদের হিয়ারোমঙ্ক (পাদরী-ভিক্ষু) বলা হয়; যেসকল ভিক্ষু যাজকত্ব প্রাপ্ত হয়েছেন তাদের হিয়ারোডিকন্‌স (যাজক-ভিক্ষু) বলা হয়। একজন স্কিমামঙ্ক যদি পুরোহিত হন তবে তাকে হিয়ারোস্কিমামঙ্ক বলা হয়। বেশিরভাগ ভিক্ষুদেরই অভিষেক হয় না; সম্প্রদায়ের প্রয়োজনমাফিক গীর্জায় উপাসনা সংক্রান্ত কাজের জন্য যতজন বিশপ দরকার, ততজনকে অভিষেক দেওয়া হয়।

পশ্চিমী খ্রিস্টানত্ব

রোমান ক্যাথলিকতন্ত্র

সেন্ট বেনেডিক্টের সম্প্রদায়
জাস্‌না গোরার বিখ্যাত মঠ, পওলিন ফাদার্স পরিচালিত শেষ মঠগুলির একটি; এই সম্প্রদায় সন্ন্যাস দলগুলির মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
স্লোভাকিয়ার সেরভেনি ক্লাসটর মঠ।

রোমান ক্যাথলিকতন্ত্র অনুসারে, যিনি সন্ন্যাসীদের জীবন রীতি অনুসারে (সেন্ট বেনেডিক্টের নিয়ম প্রভৃতি) মঠ, অ্যাবেই গীর্জা, অথবা প্রায়োরিতে নিজেদের সম্প্রদায়ের সাথে বসবাস করেন এবং যিনি ধর্মীয় নির্দেশাবলী মেনে চলেন তাকে ভিক্ষু বলা হয়। পশ্চিমী সন্ন্যাসের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নুরসিয়ার সেন্ট বেনেডিক্টকে মনে করা হয়। তিনি সেন্ট বেনেডিক্টের নিয়মাবলী প্রণয়ন করেন, যা সেন্ট বেনেডিক্টের নির্দেশাবলীর প্রতিষ্ঠা করে এবং সেস্টারশান্‌স এবং ট্র্যাপিস্টসের মত গোষ্ঠীতে সমস্ত সংস্কারসাধন করে।

পশ্চিমী দুনিয়ায় যে ধর্মীয় শপথ নেওয়া হয়, তা সেন্ট বেনেডিক্ট চালু করেন। এতে তিনটি শপথের কথা বলা আছে – আনুগত্য, জীবনের রূপান্তরণ এবং স্থায়িত্ব। আনুগত্যের মাধ্যমে একজন ভিক্ষু খ্রিস্টের অনুবর্তী হন, এবং সেটা অবশ্যই মঠের অধ্যক্ষ অথবা তার পূর্বগামীর নির্দেশ মোতাবেক হয়, জীবনের রূপান্তরণ কথাটির অর্থ হল, সাধারণভাবে, এর মাধ্যমে একজন তার নিজের জীবনকে একজন ভিক্ষুর জীবনে পরিবর্তন করেন যার অর্থ তার নিজের জীবনের এবং তার সংশ্লিষ্ট গোটা বিশ্বের কাছে তিনি নতুন জীবনলাভ করলেন। একজন খ্রিস্টিয় ভিক্ষু ঈশ্বরের কর্মের ক্রীড়নক। স্থায়িত্ব অর্থে ভিক্ষু তগাঁর বাকী জীবনটা মঠের কাজে উৎসর্গ করবে এবং তার মৃত্যুর পরে তাকে সেই মঠের সমাধিস্থলেই সমাধিস্থ করা হবে। বেনেডিক্টপন্থীদের ক্ষেত্রে স্থায়িত্বের এই শপথটি অনন্য।

অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণের মধ্যে দিয়ে আনুগত্য, দারিদ্র্য এবং বিশুদ্ধ কৌমার্যের শপথ নেওয়া হয়। দারিদ্র্যের মাধ্যমে তাদের সমস্তরকম ব্যক্তিগত সম্পত্তি পরিত্যাগ করতে হয়; কিছু কিছু ব্যতিক্রম যদিও এতে রয়েছে, যেমন ধর্মীয় পোশাক, জুতো, একটি আঙরাখা প্রভৃতি বস্ত্র যেগুলি তাদের ঊর্ধ্বতন ব্যবহার করবার অনুমতি দেন। তাদের শান্ত জীবন নির্বাহ করতে হয় এবং যা কিছু তাদের সঙ্গে থাকে তা দরিদ্রদের সাথে ভাগ করে দিতে হয়। বিশুদ্ধ কৌমার্য কথার অর্থ তারা তাদের জীবন ঈশ্বরের কাছে উৎসর্গ করতে ইচ্ছুক, তারা নারী-পুরুষের মধ্যেকার সমস্তরকম প্রেম পরিত্যাগ করেন এবং বিবাহ করেন না। তারা কোনরকম যৌন ক্রিয়াকলাপও করেন না।

একজন ভিক্ষু হতে গেলে তাকে অবশ্যই একজন যাজক পদপ্রার্থী হতে হবে, এই সময়ে তিনি মঠে বসবাস করবেন এবং যাচাই করে নেবেন তিনি ভিক্ষু হতে পারবেন কিনা। যাজক পদপ্রার্থী হিসেবে তিনি কোন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নন এবং যে কোন সময়ে তিনি মঠ পরিত্যাগ করতে পারেন। যদি যাজক পদপ্রার্থী এবং তার সম্প্রদায় মনে করেন যে তাকে ভিক্ষু হিসেব নেওয়া যেতে পারে তবে তাকে প্রথমে ব্রতী হিসেবে প্রবেশ করানো হয় এবং এই সময়ে তাকে ধর্মীয় পোশাক দান করা হয় ও তিনি মঠের জীবন শুরু করেন। ছয়মাস থেকে একবছরের ব্রতীজীবন কাটাবার পর ব্রতী কিছু সাময়িক শপথ নেয় যা বছর বছর পুনর্নবীকরণ করা যেতে পারে। কয়েক বছর পর ভিক্ষু স্থায়ী শপথ গ্রহণ করেন যা তার সারা জীবনের জন্য আবদ্ধ হয়ে যায়।

সন্ন্যাস জীবন সাধারণত তিন ধরনের প্রার্থনা নিয়ে গঠিত – লিটার্জি অফ আওয়ার্স (ডিভাইন অফিস নামেও পরিচিত), ডিভাইন রিডিং (লেকটিও ডিভাইনা) এবং ম্যানুয়াল লেবার। প্রায় সমস্ত ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে, ভিক্ষুরা সাধারণ মানের অনাড়ম্বর গৃহে বসবাস করেন যাকে কুঠুরি বলা হয়। তারা প্রতিদিন কনভেনচুয়াল মাস্‌ উদ্‌যাপন করতে একত্রিত হন এবং লিটারজি অফ আওয়ার্স মন্ত্র পাঠ করেন। বেশিরভাগ সম্প্রদায়েই, ভিক্ষুরা ভোজনালয়ে একযোগে আহারার্য সম্পন্ন করেন। যদিও তারা নীরবতার কোন শপথ গ্রহণ করেন না, তবুও অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যে সন্ধ্যাকাল থেকে পরবর্তী সকাল পর্যন্ত নীরবতা বজায় রাখবার রীতি প্রচলিত আছে এবং কিছু সম্প্রদায়ে আবার ভিক্ষুদের কাজের সময় ও সাপ্তাহিক বিশ্রামের সময় ছাড়া অন্য কোন সময় বাক্যালাপ চলে না।

বেনেডিক্টিয় সাধুরা মিউনিখ শহরের প্রতীক এবং এর নামের উৎস উদ্‌যাপন করছেন।

যেসকল ভিক্ষুদের হোলি অর্ডার বা পবিত্র আদেশ মারফৎ পুরোহিত বা যাজক হিসেবে অভিষিক্ত করা হবে বা হয়েছে তাদেরকে কয়্যার মঙ্ক বা গায়ক ভিক্ষু বলা হয়, কারণ তাদের সম্পূর্ণ ডিভাইন অফিস সমবেতভাবে গাওয়া বাধ্যতামূলক। যেসকল ভিক্ষুর পবিত্র আদেশ দ্বারা অভিষিক্ত হন না তাদের সাধারণ ভ্রাতা বলা হয়। তবে আজকের দিনে বেশিরভাগ সম্প্রদায়ে গায়ক ভিক্ষু ও সাধারণ ভ্রাতার মধ্যে বিশেষ পার্থক্য করা হয় না। যদিও ইতিহাসগতভাবে মঠবাসী এই দুই প্রকার ভিক্ষুর কর্তব্যের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। গায়ক ভিক্ষুদের কাজ প্রধানত প্রার্থনা করা, ডিভাইন অফিসের স্তোত্র সাতঘণ্টা ধরে আউড়ে চলা এবং প্রত্যহ ‘মাস’ উদ্‌যাপন করা; সেখানে সাধারণ ভ্রাতারা সম্প্রদায়ের প্রয়োজনের উদ্দেশ্যে খাদ্য সরাবরাহ করেন, ভোজন প্রস্তুত করেন, মঠ এবং মঠচত্বর রক্ষণাবেক্ষণ করেন। এই পার্থক্য ইতিহাসগতভাবে বিদ্যমান কারণ সাধারণত যেসকল ভিক্ষু ল্যাটিন পড়তে পারতেন তারা গায়ক ভিক্ষু এবং যাঁরা ল্যাটিন পড়তে পারতেন না বা নিরক্ষর ছিলেন তারা সাধারণ ভ্রাতা হিসেবে থাকতেন। যেহেতু সাধারণ ভ্রাতারা ল্যাটিনে ডিভাইন অফিস পাঠ করতে পারতেন না, তাই তারা আওয়ার ফাদার বা হেইল মেরি প্রভৃতি সহজে স্মর্তব্য স্তোত্রগুলি দিনে ১৫০বার আউড়াতেন। দ্বিতীয় ভাটিকান কাউন্সিল থেকেই গায়ক ভিক্ষু এবং সাধারণ ভ্রাতার মধ্যে পার্থক্য কমে আসতে থাকে, কারণ কাউন্সিল সেই সময় থেকে ডিভাইন অফিসকে অন্যান্য উপভাষাতেও পাঠ করবার অধিকার দেন এবং এর ফলে সমস্ত ভিক্ষুর এখানে প্রবেশ উন্মুক্ত হয়।

পশ্চিমী সন্ন্যাসে, ভিক্ষু ও ফ্রায়ারসের মধ্যে পার্থক্য করা জরুরী। ভিক্ষুরা সাধারণত মঠের ভিতরে প্রার্থনার মাধ্যমে গভীরে চিন্তাভাবনায় নিরত থাকেন; ফ্রায়ারস্‌রা সাধারণত বহির্বিশ্বের সঙ্গে সক্রিয় সংযোগ রেখে সেবাকার্য সম্পাদনা করেন। সন্ন্যাসীদের সম্প্রদায়গুলির মধ্যে রয়েছে সমস্ত বেনেডিক্টপন্থীরা (সেন্ট বেনেডিক্টপন্থী এবং এর পরবর্তী রূপ, যেমন সিস্টারসিয়ান্স্‌ এবং ট্র্যাপিস্টস্‌) এবং কার্ফুসিয়ান যাঁরা তাদের নিজস্ব সংবিধি অনুযায়ী চলে এবং সেন্ট বেনেডিক্টের নিয়মাবলী সঠিকভাবে মান্য করে না। ফ্রায়ারস্‌দের সম্প্রদায়গুলির হল ফ্রান্সিসকানস্‌, ডোমিনিকানস্‌, কার্মেলাইটস্‌ এবং অগাস্টিনিয়ানস্‌। যদিও নর্বারটাইনসের মত ক্যাননস রেগুলাররা সম্প্রদায়ের মধ্যেই বসবাস করেন।, তবুও তারা তাদের যাজক-অবস্থা অনুযায়ী পরিচিত হন, কোন সন্ন্যাস-শপথ তারা নেন না।

অ্যাঙ্গলীয়পন্থী

ইংল্যান্ডের সন্ন্যাস ধর্ম হঠাৎই সমাপ্ত হয়ে যায় যখন রাজা অষ্টম হেনরী রোমান ক্যাথলিক চার্চ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন এবং নিজেকে চার্চ অফ ইংল্যান্ডের প্রধান বলে ঘোষণা করেন। তিনি মঠের অবলুপ্তির কথা ঘোষণা করেন এবং এই সময়ে ইংল্যান্ডের সমস্ত মঠ ধ্বংস করা হয়। প্রচুর পরিমাণে ভিক্ষুদের হত্যা করা হয় এবং বাকিরা ইউরোপের অন্যান্য মঠে পালিয়ে সন্ন্যাস জীবন অতিবাহিত করেন।

চার্চ অফ ইংল্যান্ডে ক্যাথলিক আন্দোলন পুনরাবির্ভাব হতে শুরু করলে সন্ন্যাস জীবন প্রত্যাবর্তনের প্রয়োজন দেখা যায়। ১৮৪০ এর দশকে, তৎকালীন অ্যাঙ্গলীয় পুরোহিত এবং পরবর্তীকালের ক্যাথলিক কার্ডিনাল জন হেনরি নিউম্যান অক্সফোর্ডের লিটলমোরের কাছে পুরুষদের নিয়ে একটি সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকেই ভিক্ষুদের, ফ্রিঅরস্‌দের, এবং অন্যান্য পুরুষ ধর্মীয় সম্প্রদায় সৃষ্টি হয় যাকে অ্যাঙ্গলীয় কমিউন বলা হয়। অ্যাঙ্গলীয় বেনেডিক্টীয়, ফ্রান্সিয়ান্‌স, সিস্টারিয়ান্‌স প্রভৃতি সম্প্রদায় রয়েছে এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের এপিস্কোপাল চার্চে ডোমিনিকান্‌স নামক সম্প্রদায় অবস্থিত। এছাড়াও আছে সোসাইটি অফ সেন্ট জন দি এভাঞ্জেলিস্ট এবং মিরফিল্ডে রয়েছে কমিউনিটি অফ দি রেজারেকশনের মত অ্যাঙ্গলীয় সন্ন্যাসীদের অনন্য সম্প্রদায়।

কিছু কিছু অ্যাঙ্গলীয় ধর্মীয় সম্প্রদায় ধ্যানপরায়ণ আবার কেউ বা সক্রিয়, কিন্তু অ্যাঙ্গলীয়দের সন্ন্যাস জীবনের যেটি স্বতন্ত্র সেটি হল তাদের বেশিরভাগ আচার ব্যবহারই তথাকথিত “মিশ্র প্রকৃতির”। অ্যাঙ্গলীয় ভিক্ষুরা সমবেতভাবে প্রত্যহ ডিভাইন অফিস স্তোত্রপাঠ করেন, হয় তারা ব্রেভিয়ারির পূর্ণ আটটি পাঠই করেন অথবা বুক অফ কমন প্রেয়ার থেকে চারটি অফিস পাঠ করেন এবং তারা ইউক্যারিস্ট বা নৈশভোজন উদ্‌যাপন করেন। অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যে বাইরের অনেক সেবাকাজ করবার রীতি প্রচলিত রয়েছে, যেমন, দরিদ্রসেবা করা, ধর্মীয় অনুধ্যান করা অথবা অন্যান্য সক্রিয় সেবামূলক কাজকর্ম এবং এসবই হয় তাদের সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে। রোমান ক্যাথলিক ভিক্ষুদের মত, অ্যাঙ্গলীয় ভিক্ষুরাও দারিদ্র্য, বিশুদ্ধ কৌমার্য এবং আনুগত্যের সন্ন্যাস-শপথ গ্রহণ করে।

বিংশ শতকের শুরুতে যখন ক্যাথলিক আন্দোলন চরমে উঠেছিল, তখন অ্যাঙ্গলীয় কমিউনের কয়েক শত সম্প্রদায় এবং গোষ্ঠী ছিল এবং কয়েক সহস্র অনুগামী ছিল। যদিও ১৯৬০এর দশক থেকে অ্যাঙ্গলীয় কমিউনের নানা ধর্মীয় সংগঠন থেকে লোকসংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। একদা বৃহৎ এবং আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলি পরবর্তীকালে বয়োজ্যেষ্ঠদের দ্বারা গঠিত একটি একক কনভেন্ট বা মঠে পরিণত হয়। বিংশ শতকের শেষ কয়েক দশকে ব্রতীদের সংখ্যা বেশিরভাগ সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেই অত্যন্ত কমে এসেছে। কিছু সম্প্রদায় ও গোষ্ঠী ইতিমধ্যেই অবলুপ্ত হয়ে গেছে।

যাই হোক, আজকের দিনেও তবু কয়েক হাজার অ্যাঙ্গলীয় ভিক্ষু গোটা বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০০টির মত সম্প্রদায়ে কাজ করে চলেছে। সবচেয়ে অস্বাভাবিক রকমের বৃদ্ধি দেখা গেছে মেলানিসিয়ান দেশগুলিতে, যেমন সলোমন দ্বীপ, ভানুয়াতু এবং পাপুয়া নিউ গিনি। ইনি কোপুরিয়া দ্বারা ১৯২৫ সালে গুয়াদালক্যানালের তাবালিয়ায় প্রতিষ্ঠিত মেলানিসিয়ান ভ্রাতৃবর্গ হল বর্তমানে পৃথিবীর সবথেকে বড় অ্যাঙ্গলীয় সম্প্রদায়; এতে সলোমন দ্বীপ, ভানুয়াতু, পাপুয়া নিউ গিনি, ফিলিপাইন এবং যুক্তরাজ্যের মোট ৪৫০ জন ভ্রাতৃবর্গ কাজ করে চলেছেন।

লুথারপন্থা

মিশিগানের অক্সফোর্ডে অবস্থিত সেন্ট অগাস্টিন্স হাউস লুথেরান মোনাস্ট্রি।

লকম অ্যাবি এবং অ্যামেলুঙ্গস্‌বর্ন অ্যাবিতে লুথারীয় মঠের সবথেকে বড় ঐতিহ্য রয়েছে। ১৯শ এবং ২০শ শতক থেকে, লুথারপন্থার মধ্যে সন্ন্যাস জীবনের পুনর্নবীকরণের কাজ চলছে। আজকের দিনের অনেক লুথারীয়, রোমান ক্যাথলিক গীর্জায় সন্ন্যাস বিষয়ে শিক্ষা দানের কাজে নিরত।

আমেরিকার লুথারীয় প্রথায়, মিশিগানের অক্সফোর্ডের সেন্ট অগাস্টিন্‌স হাউসে ১৯৫৮ সালে যখন কিছু ব্যক্তি ফাদার আর্থার ক্রেইনহেডারের সঙ্গে মিলিত হয়ে সন্ন্যাস জীবন এবং প্রার্থনা শুরু করলেন, তখন খ্রিস্টের সেবকদের একত্রীভবন (দি কনগ্রেগেশন অফ দি সার্ভেন্টস অফ ক্রাইস্ট) প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ব্যক্তিদের আসা যাওয়া বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে। এই সম্প্রদায়টি সবসময়ই খুব ছোট, মাঝে মাঝে এর সদস্য হিসেবে কেবল মাত্র ফাদার আর্থারই থাকেন। এর ৩৫ বছরের ইতিহাসে ২৫ জন মত ব্যক্তি এই বাড়িতে কিছু সময়ের জন্য (কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর) সন্ন্যাস জীবন যাপন করবার অবকাশ পেয়েছেন, কিন্তু ১৯৮৯ সালে ফাদার আর্থারের মৃত্যুর পর এই বাড়ির স্থায়ী ব্যক্তি বলতে রয়েছেন কেবল একজনই। ২০০৬ সালের প্রথমদিকে ২ জন পেশাদার সদস্য ছিলেন এবং ২ জন দীর্ঘকালীন অতিথি ছিলেন। সুইডেনে (অস্টানবাক মঠ) এবং জার্মানিতে (সেন্ট উইগবার্টের প্রায়োরি) এই সম্প্রদায়ের সাথে তাদের ভ্রাতৃবর্গের সুদৃঢ় বন্ধন রয়েছে।

এভাঞ্জেলিকাল লুথেরান চার্চ ইন আমেরিকার প্রথায় অর্ডার অফ লুথেরান ফ্রান্সিসকানস নামে ফ্রিঅর্‌স এবং ভগিনীদের একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় রয়েছে।

বৌদ্ধধর্ম

থাইল্যান্ডের বৌদ্ধ ভিক্ষু।
লাদাখের থাক-থোক গোম্পার বাইরে ভিক্ষু বিশ্রামরত
লাদাখের লিকির গোম্পায় ভিক্ষু বাচ্চা চড়াই পাখির যত্ন নিচ্ছেন।

থেরবাদ বৌদ্ধধর্মে, সাধুদের ভিক্ষু বলা হয়। তাদের শাস্ত্রীয় সংহিতাকে পতিমোক্ষ বলা হয়, যা কিনা বৃহত্তর বিনয়ের একটি অংশ। তারা ভিক্ষুর জীবনযাপন করেন এবং প্রত্যহ সকাল হতেই ভিক্ষা সংগ্রহে (পালি : পিণ্ডপাত) বেরিয়ে পড়েন। স্থানীয় মানুষেরা ভিক্ষুদের খাদ্যদ্রব্য দান করেন, যদিও ভিক্ষুদের কিছু চাইবার কোন অনুমতি নেই। ভিক্ষুরা মঠে বসবাস করেন এবং প্রাচীন এশীয় সমাজে তাদের কাজকর্ম ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। অল্পবয়সী বালকদের শ্রমণ হিসেবে অভিষিক্ত করা হত। ভিক্ষু এবং শ্রমণ উভয়েই কেবলমাত্র সকালে আহার করতে পারতেন এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের কোন অনুমতি তাদের ছিল না। তাদের টাকা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ ছিল যদিও এই নিয়মটি এখন আর সকলে মানেন না। ভিক্ষুরা হলেন সংঘের অংশ – বুদ্ধ, ধম্ম, সংঘ – এই ত্রিরত্নের তৃতীয়টি।

মহাযান বৌদ্ধধর্ম, ‘সংঘ’ অর্থে কঠোরভাবে বলতে গেলে তাদেরকে বোঝায় যাঁরা বোধির একটা নির্দিষ্ট পর্যায় লাভ করেছেন। তাই তাদেরকে ‘গুনীবর্গের সম্প্রদায়ও’ বলা হয়, যদিও এঁরা ভিক্ষু নাও হতে পারেন (অর্থাৎ সেরকম কোন শপথ নাও নিতে পারেন)। কিছু কিছু মহাযান সম্প্রদায়ে মহিলাদেরও ‘ভিক্ষু’ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, আলাদা করে ‘ভিক্ষুণী’ বলা হয় না এবং তাদের পুরুষদের মতোই সমস্ত দিক থেকে সমান দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে দেখা হয়।

ভিক্ষুরা চারধরনের বস্তু লাভ করেন (বস্ত্র ছাড়া) : একটি নরুন, একটি সূঁচ, একটি ভিক্ষাপাত্র এবং একটি জলের ঝাঁঝরি।

বজ্রযান বৌদ্ধধর্মে, সন্ন্যাস হল ‘ব্যক্তিগত মুক্তির দীক্ষা’র একটি অংশ, এই দীক্ষা নেওয়ার কারণ ব্যক্তিগত নৈতিক আচরণের উন্নয়ন। ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীরা এখানে (সাধারণ) সংঘ গড়ে তোলেন। বজ্রযানদের ব্যক্তিগত মোক্ষলাভের দীক্ষায় চারটি ধাপ রয়েছে : একজন সাধারণ মানুষ ৫টি দীক্ষা নিতে পারেন যাকে বলা হয় “নৈতিক উৎকর্ষের দিকে অভিগমন”। পরবর্তী ধাপ হল সন্নাস জীবনে প্রবেশ ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীরা তাদের নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান করেন। এরপর, একজন ব্রতী হতে পারেন (পালি : শ্রমণ); এর শেষ এবং অন্তিম ধাপে ‘পূর্ণ অভিষিক্ত ভিক্ষু’ হিসেবে তিনি সমস্ত দীক্ষা গ্রহণ করেন। তিব্বতী ভাষার ‘গেলং’ শব্দটির সংস্কৃত অর্থ ভিক্ষু (মহিলাদের ক্ষেত্রে ‘ভিক্ষুণী’) – এই শব্দটি পালি ভাষাতেও প্রচলিত যা থেরবাদ বৌদ্ধধর্মে (শ্রীলঙ্কা, বর্মা, থাইল্যান্ড) ব্যবহৃত হয়।

চিনের হাঙ্গঝুতে বৌদ্ধভিক্ষু অনুষ্ঠান পালন করছেন।

চিনা বৌদ্ধভিক্ষুরা ঐতিহ্যাগতভাবে এবং প্রাচীন বিশ্বাস অনুসারে চিনা মার্শাল আর্ট বা কুং-ফুর সঙ্গে যুক্ত এবং ভিক্ষুরা প্রায়শই দেখা যায় মার্শাল আর্ট ছবির চরিত্র হিসেবে অভিনয় করছেন। এই সংযোগের উৎপত্তি রয়েছে শাওলিন মঠে। বোধিধর্ম নামক বৌদ্ধভিক্ষু, চীনদেশে জেন বৌদ্ধধর্ম প্রবর্তন করেন বলে মনে করা হয় এবং এও দাবী করা হয় যে তিনি দেশে প্রথম কালারিপাত্তু (যা পরবর্তীকালে কুং-ফু নামে পরিচিত) চালু করেন। শেষের দাবীটি যদিও বহু বিতর্কিত উৎস থেকে পাওয়া যায় (বোধিধর্ম, মার্শাল আর্ট এবং বিতর্কিত ভারতীয় যোগাযোগ দেখুন)। চিনা বৌদ্ধভিক্ষুদের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হল যে তারা তাদের মাথার চামড়া, আঙুল অথবা পুরোবাহুর সামনের দিকের চামড়ার অংশ ধূপকাঠির সাহায্যে পুড়িয়ে ফেলে অভিষেকের চিহ্ন এঁকে দেন।

থাইল্যান্ড ও বর্মায়, বালকবয়সী ছেলেদের মঠে ভিক্ষু হয়ে বসবাস করাটা খুব সাধারণ ব্যাপার। এদের বেশিরভাগই কয়েকবছর থাকবার পরে চলে যায়, কিন্তু কেউ কেউ তাদের বাকী জীবনটা এখানেই কাটিয়ে সন্ন্যাস পালন করে।

১৯২০র দশকে মঙ্গোলিয়ায়, শিশুসমেত প্রায় ১,১০,০০০ জন ভিক্ষু ছিলেন যা ছিল গোটা দেশের পুং-জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। তাদের অনেকেই চোইবালসানের বৌদ্ধ-বিতাড়ণের সময়ে নিহত হন।

জৈনধর্ম

আধ্যাত্মিকতার সবথেকে ঐকান্তিক রূপটি যেসকল ধর্মের মধ্যে দেখা যায়, জৈনধর্ম তাদের মধ্যে একটি; এটি পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন ধর্মগুলির একটি। জৈনধর্মে উপবাস, যোগাভ্যাস, ধ্যান প্রভৃতি জটিল চালচলন এবং কঠোরতার চর্চাকে উৎসাহিত করা হয়। জৈনধর্ম অনুসারে, একজন মানুষের চরমতম লক্ষ্য হবে নির্বাণলাভ বা মোক্ষলাভ (অর্থাৎ সংসার থেকে এবং জন্ম ও পুনর্জন্মের হাত থেকে মুক্তি)। এই কারণে আত্মাকে হতে হবে কোনরকম আসক্তি অথবা অসংযম থেকে মুক্ত। এই মুক্তি কেবলমাত্র সাধু ও সাধ্বীদের দ্বারাই লাভ করা সম্ভব এবং এই কারণে তারা পাঁচটি দীক্ষা নেন – অহিংসা, সত্যবাদিতা, অচৌর্য, অপরিগ্রহ এবং কৌমার্য।

আচার্য বিদ্যাসাগর, একজন অধিকারহীন এবং বিচ্ছিন্ন দিগম্বর জৈন সাধু

বেশিরভাগ কঠোর এবং আধ্যাত্মিক চর্চাগুলিই ২৪তম জৈন তীর্থঙ্কর বর্দ্ধমান মহাবীর শুরু করেছিলেন। আধ্যাত্মিক নিয়মনীতি সংক্রান্ত জৈন পুস্তক হল আচারাঙ্গ সূত্র। অন্যান্য রচনা যেগুলিতে আধ্যাত্মিক আচার-ব্যবহার সংক্রান্ত গভীর আলোচনা করা আছে সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আচার্য হেমচন্দ্র রচিত যোগশাস্ত্র এবং আচার্য কুন্দকুন্দ রচিত নিয়মসার। জৈনদের আধ্যাত্মিক কার্যাবলী সংক্রান্ত অন্যান্য বিখ্যাত রচনা হল – ওঘানিজ্জুত্তি, পিণ্ডানিজ্জুত্তি, চেদা সুত্ত এবং নিসিহা সুত্তফি।

শ্বেতাম্বর অথবা দিগম্বর অনুগামী পূর্ণ জৈন সাধু নিম্নলিখিত যেকোন পদাধিকারী হতে পারেন :

  • আচার্য : সম্প্রদায়ের গুরু
  • উপাধ্যায় : জ্ঞানী সাধু, যিনি আত্মপাঠ করেন এবং করান
  • মুনি : সাধারণ সাধু

নমোকর মন্ত্রে এই তিনটি বিষয়ের উল্লেখ আছে। দিগম্বর সম্প্রদায়ে, একজন নিম্নপদস্থ সাধু নিম্নলিখিত প্রকৃতির হতে পারেন :

  • আইলাক : যিনি একটি কাপড় পরিধান করেন
  • খুল্লাক : যিনি দুটি কাপড় পরিধান করেন

শ্বেতাম্বর টেরাপন্থী সম্প্রদায়ের মধ্যে নিম্নপদস্থ সাধুদের শমণ বলা হয়। দিগম্বর মহিলা সাধুদের আর্যিকা এবং শ্বেতাম্বরদের ক্ষেত্রে সাধ্বী বলা হয়।

আধ্যাত্মিক শপথ

জৈন আধ্যাত্মিকতার পাঁচটি মহাব্রত

জৈন শপথ অনুযায়ী, সাধু ও সাধ্বীরা সমস্ত রকম সম্পর্ক ত্যাগ করেন ও সব আসক্তি বর্জন করেন। জৈন আধ্যাত্মিকতায় পরিপূর্ণ অহিংসার চর্চা করা হয়। অহিংসা হল জৈন নীতির প্রথম এবং প্রাথমিক শপথ। একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গ হোক, কিংবা একজন মানুষ, তারা কাউকেই আঘাত করেন না। তাদের চলবার পথে কোন পতঙ্গ পড়লে সেটা সরাবার জন্য তারা হাতে একটি ঝাড়ু নিয়ে থাকেন। কিছু জৈন সাধু মুখে একখণ্ড কাপড় পড়ে থাকেন যাতে বায়ুজাত জীবাণু ও পতঙ্গের দুর্দৈববশত কোন ক্ষতি না হয়। অহিংসার কারণে তারা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন না। অধিকন্তু, তারা কোন যন্ত্র বা মেশিনও ব্যবহার করেন না।

যেহেতু তারা সমস্তরকম আসক্তি ও সম্পর্কশূন্য হন, তাই তারা নগ্নপদে শহর থেকে শহরে ভ্রমণ করেন এবং প্রায়শই বনাঞ্চল ও মরুভূমিও পার করেন। একই স্থানে থাকবার জন্য যাতে আসক্তি না জন্মায়, সেই কারণে জৈন সাধুরা একটি নির্দিষ্ট জায়গায় দুইমাসের অধিক বসবাস করেন না। যদিও বৃষ্টির সময়ে যেসব প্রাণীর প্রকোপ দেখা যায় তাদের হত্যা এড়াতে, চতুর্মাস নামে পরিচিত বর্ষার চারমাস, তারা একইজায়গায় অবস্থান করেন। জৈন সাধু ও সাধ্বীরা সম্পূর্ণ কৌমার্য অবলম্বন করেন। তারা বিপরীত লিঙ্গের ব্যবহার করা বসবার মঞ্চ ভাগ করেন না কিংবা স্পর্শও করেন না।

আহারাভ্যাস

কন্দমূল বিহীন পরিপূর্ণ নিরামিষ আহার ভক্ষণই হল জৈন রীতির বৈশিষ্ট্য। শ্বেতাম্বররা খাবার রান্না করেন না, গৃহস্থের বাড়ি থেকে সংগৃহীত ভিক্ষাসামগ্রীই ভক্ষণ করেন। দিগম্বর সাধুরা দিনে কেবল একবার খাবার গ্রহণ করেন। এদের কেউই খাদ্যের জন্য কখনও ভিক্ষা করেন না, কিন্তু একজন জৈন সাধু একজন গৃহস্থের খাবার গ্রহণ করতে পারেন, যদি সেই গৃহস্থ নিজে তার মন ও শরীরের দিক থেকে পবিত্র হন এবং সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায়, নির্দিষ্ট প্রথামাফিক তিনি খাবার সরবরাহ করতে পারেন। এইসময়ে, সাধু দণ্ডায়মান অবস্থায়, শুধু পরিমিত খাদ্য গ্রহণ করেন। অনশন (অর্থাৎ, খাদ্য ও পেয় পরিহার) জৈন আধ্যাত্মিকতার একটি দৈনন্দিন অঙ্গ। অনশন এক দিন অথবা তার বেশি, এমনকি একমাস ব্যাপীও চলতে পারে। নিজেদের শরীরের প্রতি যত্নবান হওয়ায় কিছু সাধু ওষুধ এবং হাসপাতাল পরিহার করেন।

কঠোর সংযম ও অন্যান্য দৈনিক অভ্যাস

শ্বেতবস্ত্রে আচার্য কালক

এঁদের অন্যান্য কঠোর তপশ্চর্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল উপবিষ্ট অবস্থায় ধ্যান অথবা ঠাণ্ডা বায়ু বহমানকালে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে তপস্যা, অথবা দুপুরে সূর্য যখন সবথেকে চরম তখন পাহাড়ের ওপর উঠে ধ্যান। এইসকল তপস্যাগুলি একজন জৈন সাধুর শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা অনুসারে গৃহীত হয়। জৈন সাধুরা সম্পূর্ণভাবে (প্রায়) অপরিগ্রহ রীতি মেনে চলেন। কিছু জৈন (শ্বেতাম্বর সাধু ও সাধ্বীরা) শুধুমাত্র শ্বেতবর্ণ সেলাইবিহীন পোশাক পরিধান করেন (ঊর্দ্ধাংশ ও নিম্নাংশের পোশাক) এবং খাবার জন্য ও ভিক্ষা সংগ্রহের জন্য একটি পাত্র ব্যবহার করেন। পুরুষ দিগম্বর সাধুরা কোন পোশাক পরিধান করেন না এবং ময়ূরপুচ্ছ নির্মিত (পিঞ্চি) নরম ঝাড়ু ব্যবহার করেন। কম্বল ছাড়া মেঝেতে শয়ন করেন ও নির্দিষ্ট কাঠের মঞ্চে উপবেশন করেন।

প্রতিদিনই তারা হয় পুঁথি পাঠ করেন, নতুবা ধ্যান কিংবা সাধারণ মানুষকে পাঠদান করেন। তারা বহির্বিশ্বের কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের দূরে রাখেন। অনেক জৈন সাধু অন্তিম সান্থারা বা সাল্লেখানার অন্তিম শপথ গ্রহণ করেন (অর্থাৎ শান্তিপূর্ণ ও সম্পর্কহীন মৃত্যু যেখানে ওষুধ, খাদ্য এবং পানীয় সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য)। এটা তখনই করা হয়, যখন মৃত্যু সমাসন্ন অথবা সাধু বোঝেন যে তার অধিক বয়সজনিত কারণে অথবা রোগশয্যার কারণে তিনি তার গৃহীত শপথ আর মেনে চলতে পারছেন না।

আকারাঙ্গ সূত্র থেকে আধ্যাত্মিক আচারবিধির ওপর কিছু উদ্ধৃতি (হার্মান জ্যাকবির ইংরেজি অনুবাদ থেকে অনুদিত) :

একজন সাধু বা সাধ্বী গ্রাম হতে গ্রামান্তরে ভ্রমণের সময়ে তাঁর সম্মুখে চারহাত দূরে নজর করবেন, এবং কোন প্রাণী দেখতে পেলে তিনি তাঁর পায়ের আঙুলে অথবা গোড়ালিতে কিংবা পায়ের পাতার দুপাশে ভর রেখে চলবেন। যদি অন্য কোন রাস্তা থাকে, তবে তিনি সেই পথ অবলম্বন করবেন, এবং সোজা পথে না গিয়ে গ্রাম থেকে গ্রাম ঘুরপথে ভ্রমণ করতে পারেন।

— তৃতীয় বাণী (৬)

“আমি এমন একজন শ্রমণ হব যাঁর কোন বাড়ি নেই, কোন সম্পদ নেই, কোন পুত্র নেই, কোন গবাদি নেই, যিনি অন্যের প্রদত্ত খাবার ভক্ষণ করেন; আমি কোন পাপকাজ করব না; গুরু, আমি যা পাইনি, তা আমি পরিত্যাগ করব।” এই শপথ গ্রহণ করে, (একজন ভিক্ষু) কোন গ্রামে অথবা অপাপবিদ্ধ কোন নগরীতে প্রবেশ করে, যা তাঁকে দেওয়া হয়নি, তা নিতে পারেন না, বা অন্যকে নিতে প্ররোচিত করতে পারেন না, অথবা অনুমতিও দিতে পারেন না।

— সপ্তম বাণী (১)

বৈষ্ণবধর্ম

দ্বৈতবাদী দার্শনিক মাধবাচার্য অষ্টমঠ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি প্রতিটি মঠে একজন করে সাধু (যাঁকে স্থানীয় ভাষায় স্বামীজী বা স্বামীগালু বলা হয়) নিযুক্ত করেন, যিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মাধবাচার্য মূর্তির চারিদিকে প্রদক্ষিণ করে পুজো করবার অধিকার পান। প্রতিটি মঠের স্বামীজী চোদ্দো বছর পর পুজো করবার সুযোগ পান। এই প্রথাটিকে পর্যায় বলা হয় এবং এটা তার সম্প্রদায়ের (যেমন, বৃন্দাবনের গৌড়ীয় বৈষ্ণব রাধারমণ মন্দির) বাইরেও চর্চা করা যায়।

বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মত, ইন্টারন্যাশানাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশিয়াসনেস (ইস্কন) বা হরে কৃষ্ণ (এই নামেই তারা অধিক পরিচিত) থেকে আসা ব্রহ্মচারী সাধুরা ভারতের বাইরে থাকা বৈষ্ণবদের মধ্যে সর্বোত্তম। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা এইসকল সাধুরা একই রকমের দেখতে হয়। তাদের বাহ্যরূপ – সাধারণ গেরুয়া ধুতি, টিকিযুক্ত মুণ্ডিত মস্তক, তুলসীর মালা এবং তিলক চিহ্ন – এবং সামাজিক রীতিনীতি (সাধনা) যা কিনা হাজার বছর আগেকার বৈদিক যুগের বর্ণাশ্রম সমাজের থেকে নেওয়া। তাদের সামাজিক পরিকল্পনা সন্ন্যাসী এবং সাধারণ মানুষ – উভয়কেই অন্তর্গত করেছে এবং প্রত্যেকে তাদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের গুণ ও কর্ম অনুযায়ী নিজস্ব কাজ করে।

ইস্কন প্রথমে সন্ন্যাসীদের দল হিসেবেই শুরু হয়েছিল কিন্তু এখন এর বেশিরভাগ সদস্যই সাধারণ লোক হয়ে গেছে। যদিও তাদের বেশিরভাগই কিছু সময় ধরে সাধু হিসেবে কাটিয়েছিলেন। ইস্কনে যোগদানকারী নতুন ব্যক্তিরা যাঁরা পূর্ণ সদস্য হতে চায় (যাঁরা এর কেন্দ্রে বসবাস করেন), তাদের প্রথমে তিনমাসের জন্য ভক্ত হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যার মধ্যে রয়েছে ব্রহ্মচারী জীবনের প্রাথমিক পাঠ। এরপর তারা ঠিক করে তারা কি সন্ন্যাসী হিসেবেই থাকতে চায় নাকি গৃহস্থ হয়ে বিবাহিত জীবন কাটাতে চায়।

পঞ্চাশ বছরের বেশি বয়স্ক ব্রহ্মচারী (ইস্কনের নিয়মানুসারে) সন্ন্যাসী হতে পারে। বর্ণাশ্রম সমাজে সন্ন্যাস হল জীবনের একটি উচ্চতম স্তর যেখানে জীবনকে আধ্যাত্মিক কার্যাবলীর মধ্যে সম্পূর্ণরূপে উৎসর্গ করতে হয়। এটি একটি স্থায়ী প্রক্রিয়া এবং কেউ এটা ছেড়ে যেতে পারে না। একজন সন্ন্যাসী স্বামী পদবি প্রাপ্ত হন। বয়স্ক গৃহস্থ, যাঁদের ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেছে, তারা প্রথানুযায়ী বানপ্রস্থ জীবন গ্রহণ করবেন বলে আশা করা যায়।

ভারতীয় এবং অধুনা পশ্চিমী সন্ন্যাস সম্প্রদায়ের ভূমিকা বছরের পর বছর ধরে কিছু হলেও বদলাচ্ছে, চারিপাশের সামাজিক গঠনের পরিবর্তনের সাথে সাথে।

আরও দেখুন

  • Into Great Silence — রোমান ক্যাথলিক কার্থুসিয়ান সম্প্রদায়ের হার্মিট ভিক্ষুদের ওপর পুরস্কৃত তথ্যচিত্র।
  • মেনচিন, এবং মোনাহান, গেলিক নাম, আইরিশ: মানাচ, লাতিন: মোনাচুস, "একজন সাধু"।

বহিঃসংযোগ


Новое сообщение